<SiteLock

শাসক বর্ণের পরিবর্তনশীল প্রাধান্য ও কৃষক অসন্তোষ


অনসুল কুমার

ভাষান্তর- বিধান চন্দ্র দাস

anshul“এটা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য যে ব্রাহ্মণ সবসময়ই অন্যান্য শ্রেণীদের সহযোগী হয়েছে এবং তারা তাদের তখনই শাসক শ্রেণীর মর্যাদা দিয়েছে, যখন সেই শ্রেণীগুলো তাদের অধীনে থেকে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে। প্রাচীন এবং মধ্যযুগে এই রকম জোট তারা করত ক্ষত্রিয় অথবা যোদ্ধা শ্রেণীদের সঙ্গে এবং দুজনে মিলে রাজত্ব করত বাকি জনগণের উপর যেখানে ব্রাহ্মন তার কলমের দ্বারা এবং ক্ষত্রিয় তার তরবারির দ্বারা এই জনগণকে নিষ্পেষিত করত। বর্তমানে ব্রাহ্মণরা জোট তৈরি করেছে বৈশ্যদের সঙ্গে, যাদের বেনিয়া বলা হয়। এই ক্ষত্রিয়দের ছেড়ে বেনিয়াদের প্রতি জোটের স্থানান্তরটা স্বাভাবিক। বর্তমানে তরবারির চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল বাণিজ্য করে পাওয়া অর্থ।পক্ষ বদলের এটা একটা কারণ । দ্বিতীয় কারণটা হল সমগ্র রাজনৈতিক যন্ত্রটিকে চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা। অর্থ শুধুমাত্র বেনিয়াদের থেকে পাওয়া যায়। এই হল সেই বেনিয়া , যারা কংগ্রেসকে প্রচুর পরিমানে টাকার যোগান দেয় কারণ মিঃ গান্ধী হলেন একজন বেনিয়া এবং তারা নিজেরা এটাও খুব ভালোভাবে বুঝেছে যে রাজনীতিতে অর্থ বিনিয়োগ তাদের বৃহৎ মুনাফা এনে দেবে।“--- বি আর আম্বেদকর, কংগ্রেস এবং গান্ধী অস্পৃশ্যদের জন্য কি করেছে।

ভারত হল একটি বিচিত্র জাতি রাষ্ট্র, এমন কি তা বিচিত্র বৈশিষ্ট্যসূচক অন্যান্য ওরিয়েন্টাল জাতিরাষ্ট্রের মধ্যেও অদ্ভুত। এই বিচিত্রতা হল ভারতীয় জাতি রাষ্ট্রের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য যেটা জাত ব্যবস্থা নামক  প্রতিষ্ঠানের দ্বারা নির্ধারিত হয়, যা রাজনৈতিক-অর্থনীতি, বাজার, সমাজ, ব্যক্তিবিশেষের ধর্মীয় এবং প্রতিদিনের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলকে নিয়ন্ত্রিত করে। তাই এটা কষ্টকল্পিত বলে মনে হয় না যখন বিশিষ্ট নৃবিজ্ঞানী নিকোলাস ড্রিক্স বলেন যে, "ভারতের কথা ভাবার সময় জাতের প্রসঙ্গটা না এসে পারে না"।

যখন শ্রেণীসমাজের কথা ভাবছি তখন যেমন বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সর্বহারাদের সংগ্রামের ব্যাপারটা মাথায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি যখন জাতের কথা ভাবছি তখন শীর্ষস্থানীয় শাসক-বর্ণ ব্রাহ্মন এবং তাদের অধঃস্তনীয় শাসিত জাতগুলোর পরস্পরের মধ্যে চলা সংগ্রামের কথাটা মাথায় রাখাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একমাত্র সমস্যা হচ্ছে এই যে, শীর্ষস্থানীয় শাসক ব্রাহ্মণ-বর্ণটি সর্বদাই প্রচ্ছন্ন অবস্থায় থেকে যায়।

বাবাসাহেব দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গেই একথা লিখেছেন যে, " ভারতের ইতিহাস ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে বৌদ্ধমতবাদের দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কিছুই না।" এই দুটো পরস্পরবিরোধী মতবাদ সর্বদা একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে এবং এদের দ্বান্দ্বিকতার দ্বারাই সময়ে সময়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক-অর্থনীতি এবং সমাজসমূহ নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে যে শব্দটি উল্লেখযোগ্য তা হল "দ্বন্দ্ব"। এটি নির্দেশ করছে যে এই দুটি পরস্পরবিরোধী চিন্তাধারাই জনপ্রিয় ছিল এবং এদুটির মধ্যে পরস্পর পরস্পরকে দমন করবার একটি সংগ্রাম চলত। এটা সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণযোগ্য সত্য নয় যে, ব্রাহ্মণ্যবাদ সর্বদাই শাসক-শক্তিরূপে আসীন ছিল এবং এর বিপরীতে বৌদ্ধমতবাদ ছিল একটা পরাজিত চিন্তাধারা। এই কারনে আজকের দিনেও এটা একটা চলতে থাকা সংগ্রাম। ইদানীং ব্রাহ্মণরা নিশ্চিতভাবে সমস্ত তন্ত্রটিকে শ্বাসরোধ করে পরিচালনা করছে তাদেরই অন্যান্য উচ্চবর্ণের দ্বারা গঠিত জোটের সাহায্যে। ঐতিহাসিক সময় থেকেই সবসময়ই এই চেষ্টাটিই তারা করে এসেছে। তারা সর্বদা জানে যে তারা নিজেরা সংখ্যালঘু এবং  সেইজন্য তাদের অন্যদের সমর্থনের দরকার যারা তাদের জাগতিক এবং চিন্তাগত দিক থেকে সমৃদ্ধ করবে যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

একটা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের জোটসঙ্গী ছিল সামরিক-অভিজাত অর্থাৎ ক্ষত্রিয় বর্ণের লোকেরা, যখন প্রাক-আধুনিক ভারতীয় সমাজ গুলো মূলত সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সম্বলিত ছিল এবং এই সামন্ততান্ত্রিকতা কে বজায় রাখবার জন্য সামরিক শ্রেণীর দরকার হতো, যেখানে কর্তৃত্ব  নিয়ন্ত্রিত হত পেশী শক্তির দ্বারা। সৈন্যবাহিনীর দ্বারা নিজেদের কর্তৃত্ব নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে ব্রাহ্মনরা ক্ষত্রিয়বর্ণের কাছে সাহায্য চাইত। এটা সম্ভব হত ব্রাহ্মন কতৃক ক্ষত্রিয়বর্ণের রাজাদের সামাজিক বৈধতা প্রদানের মধ্য দিয়ে, তাদের নামে বিজয়গাথা রচনা এবং তাদের "মহারাজাধিরাজ", "বিক্রমাদিত্য" ইত্যাদি বিভিন্ন উপাধি প্রদানের মাধ্যমে এবং অন্যান্য দাম্ভিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে যা সেই রাজাদের তারা আদপে যা তার চাইতেও বৃহত্তর রূপে দৃশ্যমান করে তুলত। এটা যে শুধুমাত্র রাজ্যের মধ্যে সামরিক-শাসনকে বৈধতা প্রদান করত এমনটাই নয়, অধিকন্তু রাজ্যক্ষেত্রের জমির একটা বড় অংশ ব্রাহ্মণদের প্রতি মঞ্জুর করা হত নিষ্কর সম্পত্তি হিসাবে, যাকে বলা হত "ব্রহ্মত্তর"।  

ব্রিটিশদের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে সময় পরিবর্তীত হয়ে যায় এবং সমাজের মধ্যেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। সেই বিশ্বায়নের যুগ থেকেই বহির্বিশ্বের অন্যান্য সামরিক-শক্তি, বাজার-অর্থনীতি মানুষের মানবিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সংলাপের নিয়ন্ত্রণের উপর কর্তৃত্ব জমাতে শুরু করে। এই কারনেই এই সময়ে পূর্ববর্তী বিভিন্ন জাতেরা যারা বর্ণাশ্রমভিত্তিক ক্ষমতার ক্রম অনুসারে অপেক্ষাকৃত নিচের দিকে ছিল তারা বৃটিশ সম্রাজ্যবাদের দ্বারা সূচিত হওয়া ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে সম্পদশালী হয়ে উঠেছিল। জাতব্যবস্থা সম্বলিত সমাজে যে ক্রমিক শ্রেণীবিন্যাস পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছিল এটা জাতব্যবস্থার জন্মদাতা ব্রাহ্মন ছাড়া কেই বা ভালো জানত।

ক্ষত্রিয়রা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে অলস, নিশ্চেষ্ট এবং প্রায় নপুংসকে পরিণত হয়ে গেছিল ব্রিটিশ কূটনীতির প্রভাবে যার কোনো সংশোধন/সংস্কার সম্ভব ছিল না। ইতিমধ্যেই তাদের যোদ্ধাসুলভ আত্মপ্রত্যয়/দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছিল এবং তারা ব্রিটিশ শক্তির অধীনে পুতুল-শাসকে পরিণত হয়ে গেছিল। এই সময় থেকে তারা ব্রিটিশ কতৃক প্রদেয় বিশাল পরিমান অর্থের উপর নির্ভর করে টিকে থাকত যেটা তাদের দেওয়া হত আর্থিক অনুদান হিসাবে এবং এইটুকু নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হত যে তারা হল রাজপুত, রাজকীয়, মহান।  এই অহংকারী আচরণ তাদের পরাজয়ের বাস্তবিক কারন ছিল এবং তারা তাদের পোষ্য কুকুরের জন্মদিন বা বিবাহ অনুষ্ঠান উদযাপন এবং গর্বের সঙ্গে জমিয়ে রাখা মণিমানিক্য-সোনাদানা এবং  প্রত্নতাত্বিক শিল্পনিদর্শনগুলো লোকদেখানোর মধ্য দিয়ে নিজেদের অন্তরের গভীরে প্রোথিত থাকা নিদারুণ বেদনাকে লাঘব করার চেষ্টা করত। ক্ষত্রিয়দের এই হাল সেই সময়ের ব্রাহ্মণদের কাছে খুব ভালো ভাবে জানা ছিল, সেই কারণেই বব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের নয়, বরং ব্রিটিশদের তোষামোদি এবং মোসাহেবি করত ভারতীয় সমাজে নিজেদের কতৃত্ব বজায় রাখবার জন্য। এটা সেই অবস্থার সূচনামাত্র ছিল যেখানে ব্রাহ্মণের বাস্তবিক কোনো প্রয়োজন ছিল না ক্ষত্রিয়দের আনুগত্যের। অতি সাম্প্রতিক কালেও এটা দেখা যাচ্ছে যোগী আদিত্যনাথের হঠাৎ উত্থানের মধ্যে, যিনি বর্ণের দিক থেকে ক্ষত্রিয় এবং আসীন হয়েছেন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরূপে। যোগীর এই উত্থান ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে ক্ষত্রিয়দের  এক তুর্যনিনাদ যেখানে তারা যেন চিৎকার করে বলছে, "আমাদের সেবা এখনো গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা আপনাদের অনুগত থাকার উপযুক্ত।" কিন্তু ব্রাহ্মণ জানে কোথায় নিজের জোটসঙ্গী খুঁজেতে হবে। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়দের মধ্যে এই ধস্তাধস্তি কতদিন চলবে সেটা অনিশ্চিত কিন্তু এটা সত্য যে ব্রাহ্মনরা ইতিমধ্যেই ক্ষত্রিয়দের বাস্তব ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যাও বা একটু আধটু স্বীকৃতি ক্ষত্রিয়রা পায় তা মূলত রাম-রাজ্যের নামে চালানো হিন্দু এবং মুসলিমের ধর্মীয় এবং পৌরাণিক দৈত্ব বজায় রাখবার জন্য দেওয়া হয়, যাতে করে এর পিছনে ব্রাহ্মণ নতূন নতূন সমীকরণ এবং জোট রচনা করতে পারে।

"ইতিহাসে বেনিয়াদের অতি দুষ্ট পরজীবী শ্রেণী রূপে জানা যায়। তার কাছে অনৈতিক উপায়ে অর্থ রোজগার করাটা একেবারে বিবেকবোধ শূন্য প্রক্রিয়া। সে একজন দাদনদারের মতো যে মহামারীর সময় সম্পদশালী হয়ে ওঠে। দাদনদারের সঙ্গে বেনিয়ার শুধুমাত্র একটি পার্থক্য হল যে, দাদনদার মহামারী তৈরি করে না কিন্তু বেনিয়া তা করে। সে তার অর্থ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করে না। দারিদ্র সৃষ্টি এবং আরো গভীর করতে সে টাকা ধার দেয় অনুৎপাদক উদ্দেশ্যে। সে সুদের উপর নির্ভর হয়ে বাঁচে এবং তার ধর্ম তাকে সেভাবেই নির্দেশ দিয়েছে যে ঋণদান হল তার পেশা যেটা তাকে মনু কতৃক নির্দ্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। সে এটাকে ন্যায্য অধিকার বলে মনে করে। ব্রাহ্মন বিচারপতির সাহায্যে ও তাঁর ডিক্রি জারির বলে সে কারবার চালিয়ে যায়। সুদ, সুদের ওপর সুদ সে যোগ করে চলে অবিরাম এবং এভাবেই তার জালের মধ্যে বহু পরিবারকে অনন্তকালের জন্য টেনে আনে:  ঋণদাতারা তাকে যত খুশি ঋণ পরিশোধ করুক না কেন, সর্বদাই ঋণগ্রস্ত থেকে যান। বিবেকহীনভাবে হেন প্রতারণা নেই, হেন প্রবঞ্চনা নেই যেটা সে করতে পারে না। সমগ্র জাতির উপর তার সম্পূর্ণ কব্জা। সমস্ত দরিদ্র, উপবাসী, আশিক্ষিত ভারত  বন্ধক রাখা বেনিয়ার কাছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ব্রাহ্মণ  ক্রীতদাসে করেছে মনকে, বেনিয়া ক্রীতদাস করেছে শরীরকে। এরা নিজেদের মধ্যে শাসক শ্রেণীর লুটের মাল ভাগ করে নেয়” --- বি আর আম্বেদকর, কংগ্রেস এবং গান্ধী অস্পৃশ্যদের জন্য কি করেছে।

দ্বিতীত বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, গোটা বিশ্ব জুড়ে বাজার কেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা প্রকট হতে শুরু করে এবং ভারত একটি জাতি-রাষ্ট্র রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ব্রাহ্মন, ক্ষত্রিয়ের পুরোনো জোট ইতিমধ্যেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল এবং ব্রাহ্মণরা একটি নতুন 'শ্রেণীর' অন্বেষণ করছিল নিজেদের কতৃত্ব বজায় রাখবার জন্য। বেশ কিছু সময় ধরে তারা কোনোরকম জোট ছাড়াই চালিয়ে নিচ্ছিল IAS, IPS এর আকারে একটি ব্রাহ্মণ্য আমলাতান্ত্রিক-অভিজাতবর্গ  এবং IIT, IIM গুলো থেকে বেরিয়ে আসা একটি প্রযুক্তিতান্ত্রিক-অভিজাতবর্গ তৈরি করে নিয়ে। এরমধ্যেই নতুন জোট-সঙ্গী খোঁজার প্রক্রিয়াটিও অবিরত চলছিল। এই সময়ে খুব মেপেজুপে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল যাতে করে জোটসঙ্গী গুলো তাদের উপর কতৃত্ব করতে না পারে এবং তাদের যেন ক্ষত্রিয়দের মত দুরবস্থায় পড়তে না হয়। এটা একটা প্রধান কারণ ছিল যার জন্য বাজার কেন্দ্রিক সমাজসমূহের উদ্ভবের সত্বেও তারা ভারত রাষ্ট্রকে আপাতদৃষ্টিতে একটি সামাজিক-অর্থনীতির দিকে নিয়ে গিয়েছিল যেখানে বাজারগুলো  সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে একাডেমি, গণমাধ্যম এবং বিচারব্যবস্থাতেও ব্রাহ্মণদের দৃঢ়ীকরণের প্রক্রিয়াটিও চলছিল এবং এখানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তাদের নিজেদের যথেষ্ট ক্ষমতাও ছিল এগুলো চালিত করার এবং সময়ে সময়ে জনমতকেও সজ্ঞায়িত করবার। এটা করা হচ্ছিল সম্পূর্ণভাবে নতুন জোট-সঙ্গী বেনিয়াদের  নিয়ন্ত্রনে রাখবার জন্য। এটা প্রায়ই একটা ভুল বোঝা হয় যে ভারত আন্তরিক ভাবে একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। বাস্তবিক ভাবে সমস্ত নিয়ন্ত্রণ এখনও ব্রাহ্মনদের হাতে, পুঁজিবাদী শ্রেণী, বেনিয়ারা যথেষ্ট সৌভাগ্যবান যে তারা এমন একটা সময়ে আছে, যখন তাদের সেবা ব্রাহ্মণদের কাছে দরকার হয়ে পড়েছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, ভারতীয় জাতি-রাষ্ট্র মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বিধিবদ্ধ করে একটি  দৃষ্টান্ত তৈরি করে, যেখানে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীদের সরকারি চাকুরীতে নিয়োগের জন্য সংরক্ষণ মেনে নেওয়া হয়। এই দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন পুনরায় একটি সংকেত ছিল ক্ষত্রিয়দের  গরিমা হারাবার এবং ব্রাহ্মন কর্তৃক তাদের জোটসঙ্গী হিসেবে পরিত্যক্ত হবার যার ক্ষোভের উদ্গীরন হয়েছিল ভি.পি. সিংহের রাজনীতিতে, যিনি একজন ক্ষত্রিয় ছিলেন।

স্বাধীনতার কিছু সময় পরেই, ব্রাহ্মন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল অন্য আর একদল জোট-সঙ্গী জোটাতে। এই জোট-সঙ্গীরা ছিল জনসংখ্যার দিক থেকে ভারী কৃষিজীবী জাতসমূহ যেমন- জাঠ, কুর্মি, জাঠ-শিখ। প্রতি দশকে যেভাবে দ্রুত জনসংখ্যা বেড়ে যাচ্ছিল, জনসংখ্যার খাদ্যযোগানের প্রয়োজনও তেমন তৈরি হচ্ছিল। এখানে অনেকেই ভুল ধারনা নিয়ে চলেন যে, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল দেশের সমগ্র জনগনকেই খাদ্য যোগান দেবার। কিন্তু বাস্তব অন্য কথা বলে। বিংশ শতকের প্রত্যেক দশক অতিবাহিত হবার সাথে সাথে মহানগর এবং শহরাঞ্চলে ব্রাহ্মণদের জনসংখ্যা বেড়েই যাচ্ছিল এবং দিনের দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছিল তাদের প্রতিদিনের আহার্য যোগান দেবার। সুতরাং, কৃষিজীবী জাতগুলির এবং অন্যান্য নিম্নজাতের শ্রমকে ব্যবহার করার জন্য ঝুঠা ভূমিসংস্কার আইনের হেঁয়ালির প্রহসন শুরু করা হল।

ব্রাহ্মণের উদ্দেশ্য ছিল যে খালি তাদের পেট যেন ভর্তি থাকে সেটা নিশ্চিত করা এবং বৃহত্তর জনগন নিয়ে বাস্তবিকই তাদের কোনো চিন্তা ছিল না কারণ সেটা যদি সত্যিই থাকত তাহলে এমন কি ২০২০ তেও ক্ষুধার কারনে প্রতিদিন ৩০০০ মানুষ মারা যেত না। সুতরাং, মন্ডল পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে, কৃষিজীবী জাত গুলো বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে, যেটা ব্রাহ্মণদের উপর চাপ তৈরি করছে আপাতভাবে সামাজিক-অর্থনীতির দরজা উন্মুক্ত করবার জন্য এবং একটি নব্য-উদারবাদী মুক্ত বাজারের বিশ্বে প্রবেশ করবার জন্য এবং পুনরায় তাদের  আর এক জোটসঙ্গী বেনিয়াদের হাত ধরবার জন্য। কৃষিজীবী এবং অন্যান্য পিছিয়ে থাকা জাতসমূহের জাতি-বর্ণ বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ বরাবরই ব্রাহ্মণদের বিব্রত করেছে এবং তারা ইতিমধ্যেই তাদের থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছিল। যখন কিনা এই কৃষিজীবী জাতগুলো যেমন জাঠ, জাঠ-শিখ, কুর্মি, যাদব রা নিজেদের রাজপুত হবার দাবি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং কঠোর সংগ্রাম করছিল ব্রাহ্মণের বিশ্বস্ততা/আনুগত্য হাসিল করবার জন্য, ব্রাহ্মন তখনই ভেবে রেখেছিল তাদের লাথি মেরে বের করে দেবার জন্য ঠিক যেমনটি তারা করেছিল রাজপুত, ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে।

এই মুহুর্তে ব্রাহ্মণরা কৃষিজীবী জাতগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছে, ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে  এবং তাদের সেই জায়গায় ফেরৎ পাঠাতে চাইছে যেখানে আগে তারা ছিল। নব্য-উদারবাদী শাসনের চরম অবস্থা দরজায় কড়া নাড়ছে এবং ব্রাহ্মন পুনরায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে বেনিয়াদের  জোট-সঙ্গী হিসাবে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় নতুন সমীকরণ এবং হেরফের করে নতুন 'শ্রেণীসমূহ' খুঁজে পেতে যারা তাদের বন্ধু হিসেবে কাজ করবে তথ্যপ্রযুক্তি সম্পন্ন সমাজে, IT সমাজে যা হল দেশের ভবিষ্যৎ। যে কেউ  আশ্চর্য হবেন আজকাল জাতব্যবস্থার নতুন ক্রমের উদ্ভব হতে দেখে এবং হয়ত এই সময়ে শ্রেণীগত প্রেক্ষাপট এবং ব্রাহ্মণের সঙ্গে সান্নিধ্যই  ঠিক করে দেবে কোন নতুন জাতগুলো বা জাতগুলোর কোনো অংশ তাদের জোটে থাকবে। এই জোটের শরিক হিসাবে কোনো কোনো বহুজন-জাতি থাকতেই পারে। কিন্তু যতক্ষন না বহুজনরা বুঝতে না পারছে যে ব্রাহ্মণ কিভাবে খেলাটা খেলছে, তারা তাকে পুনরায় ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হবে না যেভাবে বুদ্ধ করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে বহুজনদের কাছে  গুরুত্বপূর্ণ হল ব্রাহ্মণদের ছুড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট দেখে আবিষ্ট না হয়ে এবং নিজেদের মিথ্যা জাত-গর্বে আচ্ছন্ন না থেকে কাদের প্রতি তারা আনুগত্য এবং ভরসা রাখবে সে ব্যাপারে বিবেচনা করে নিশ্চিত হওয়া।

This is the translated version of the original English article published on 9th December 2020 here

~~~

 

Anshul Kumar is a graduate in sociology and anthropology.

Bidhan Chandra Das is an Ambedkarite activist and scholar. He is associated with grassroots level activism in West Bengal.

 

Other Related Articles

The promise of Mook Nayak
Wednesday, 14 April 2021
  Dr. Babasaheb Ambedkar From the pages of Bahishkrit Bharat (Untouchable India) [The following is from an editorial (translated from Marathi) written by Babasaheb Ambedkar for one of the... Read More...
The OBC case of ‘House Negro’ and ‘Field Negro’
Sunday, 11 April 2021
  Anand Kshirsagar There was a time in the American antebellum South like Georgia, Mississippi, Missouri, Alabama, and South Carolina where economic, social, political, cultural, and religious... Read More...
Moral Right to Labour
Wednesday, 07 April 2021
Pralay Nagrale The recent mobilization of the Valmiki community all over India was important in fighting for justice for the 19 year old girl of Bulgaddhi village of district Hathras, because till... Read More...
Ram Van Gaman Path: Who are you to decide our vision for development?
Monday, 05 April 2021
Bodhi Ramteke What could be the priorities for any poorest state, where literacy rate is low, malnutrition level is high, having no proper educational & health infrastructure and other endless... Read More...
Myth of Brahmin Merit: Refutation of Superiority
Sunday, 21 March 2021
  Pranav Jeevan P We have been hearing arguments that try to justify the superiority and monopoly of Brahmins and savarnas in the fields of education and governance based on genetics. Their... Read More...

Recent Popular Articles

The Ruling Caste's changing priorities and the Farmer Unrest
Tuesday, 08 December 2020
  Anshul Kumar “History shows that the Brahmin has always had other classes as his allies to whom he was ready to accord the status of a governing class provided they were prepared to work... Read More...
How to write anti-caste solidarity texts
Monday, 02 November 2020
Dr. Murali Shanmugavelan Ensure that “Dalit” appears as a prefix whenever the victim is mentioned. The phrase “Dalit victim” helps your readers understand the difference between Dalits and... Read More...
How to look 'Dalit' in the Savarna imagination
Wednesday, 04 November 2020
  Bobby Kunhu  When I first watched the classic 1972 Luis Bunuel comedy, The Discreet Charm of the Bourgeouise, in 1994 or 95, I could not have imagined that it was possible to adapt the... Read More...
So you want to ally with the Dalit Rights Movement?
Tuesday, 20 October 2020
  Shivani Waldekar On 25th May 2020, George Floyd, an unarmed Black man was murdered in police custody in Minneapolis, USA. A video showing a white police officer kneeling on his neck for almost... Read More...
The Karnataka anti-cow slaughter bill is against the poor
Tuesday, 15 December 2020
Dr. Sylvia Karpagam "If India's politicians had any connect with land and farming, they would understand the organic relationship farmers have with livestock, milk, manure and killing of cows. It is... Read More...